হুমায়ুন ফরীদি: বুকভাঙা এক দীর্ঘশ্বাসের নাম

0

২০১২ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি, ৬০ বছরে বসন্তের প্রথম সকালে পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। সেই থেকে শোবিজ অঙ্গনে এক আফসোসের নাম হুমায়ুন ফরীদি। এই স্থায়ী আফসোসটা ক্ষনে ক্ষনেই জেগে উঠে। কান পাতলেই শোনা যায়। কি অভিনেতা কি পরিচালক, হোক সেটা সিনেমা, নাটক, টেলিফিল্ম অথবা মঞ্চের- সবারই এক আফসোস- এমন শক্তিমান অভিনেতা ছাড়া মনের মতো চরিত্র ফুটিয়ে তোলা মুশকিল। সেই মনের মতো চরিত্রটি ফুটিয়ে তোলার মানুষটি আর নেই! সবার দীর্ঘশ্বাস- ‘এ দেশে এ ক্যারেক্টার কেবল ফরিদী ভাই-ই পারতেন। কিন্তু ফরিদী ভাই তো…’

হুমায়ুন ফরীদিকে নিয়ে তাঁর এক ভক্তের মন্তব্য-

ছোট বেলায় সংশপ্তক নাটকটি দেখে একটা লোকের ঊপর আমার প্রচন্ড রাগ হত। ভাবতাম! এই লোকটা এত খারাপ কেন। একটু বড় হলে অভিনয় ব্যাপারটা কী, কিছুটা বুঝতে শিখি। ঠিক তখনই ওই লোকটার প্রেমে পড়ি, প্রেমে পড়ি তার অভিনয়ের। সেই লোকটি হচ্ছেন হুমায়ুন ফরীদি। কি অসাধারন অভিনয়! ঠিকঠাক অভিনয়টা দেখার জন্য তাঁর বিকল্প খুবই কম আছে। টিভি খুলেই যদি কখনো হুমায়ুন ফরীদির কোনও নাটক বা সিনেমা দেখতাম, তাহলে আমি সেটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত টিভি বন্ধ করতাম না। কিন্তু যখন এই লোকটার মৃত্যুর খবর শুনলাম, অবশ্য তখন আমি কাঁদিনি, তবে কোথায় যেন একটা শুন্যতা আনুভব করলাম। মনে হলো আমার কী যেন একটা হারিয়ে গেল। আমার বাংলাদেশ কী যেন একটা হারালো। কোন একটা স্থান যেন শুন্য হলো। যেটা কখনো আর পূরণ হবার নয় ………

বেসরকারী এক টেলিভিশনে একবার হুমায়ুন ফরীদির একটি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। উপস্থাপক ছিলেন লেখক ইমদাদুল হক মিলন। সেই সাক্ষাৎকার থেকেই কিছু কথা তুলে ধরছি।

প্রথমেই তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, তিনি নাকি দিনে ৪-৫ বার ভাত খান। এ প্রশ্নের জবাবে ফরীদি বলেন, তিনি আসলে অল্প আহার করেন। মানুষ তিন বেলায় যা খায়, তিনি অল্প অল্প করে ৪-৫ বারে তা খান। তবে প্রতিবার যে ভাত খান তা ঠিক নয়। আইটেম হিসেবে রুটি, সবজিও খান তিনি।

এরপর প্রশ্ন করা হয় তার নাম নিয়ে। তিনি বলেন ‘ফরীদি’ লেখা সহজ বলেই তিনি শব্দটি এভাবে লেখেন, এছাড়া বিশেষ কোন কারণ নেই। আর তার মার নাম ছিল ফরিদা ইসলাম, সেখান থেকেই তার নামকরণ হয়েছে।

এরপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তার অভিনয় করাটা তার পরিবার দ্বারা কোনভাবে প্রভাবিত কিনা। তিনি এর উত্তরে ‘না’ বলেন। এবং আরও বলেন, তার বাবা একবার অভিনয় করেছিলেন। তবে তার পরিবার থেকে তিনি প্রভাবিত হননি।

যুদ্ধের পর নৈরাশ্য থেকেই তিনি অভিনয়ে যোগ দেন। অনেকে বলে তিনি যাত্রায় অভিনয় করতেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন তিনি শুধু এক মৌসুম যাত্রায় কাজ করেছেন। যাত্রার মাধ্যমে তার অভিনয় জীবন শুরু এটা ভুল কথা।

‘একজন ভালো অভিনেতা দিনের চব্বিশ ঘণ্টাই অভিনয় করে চলেন,’ বলতেন তিনি। কিন্তু তিনি আমাদের ছেড়ে ওপারে চলে গেলেন চিরতরে, এটা কোন অভিনয় নয়। সত্যিই তিনি চলে গেলেন আমাদের উদাস করে। তাকে আর আমরা কখনও ফিরে পাব না।

নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ আক্ষেপ করে প্রয়াত নন্দিত অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আচ্ছা, এই মানুষটি কী অভিনয়কলায় একটি একুশে পদক পেতে পারেন না! এই সম্মান কী তার প্রাপ্য নয়?’ বেঁচে থাকতে ফরীদি তা পাননি। তবে মরণোত্তর একুশে পদক পাচ্ছেন তিনি। অভিনয় অঙ্গনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এই স্বীকৃতি এবার দিলো সরকার।

১৯৫২ সালের ২৯ মে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ুন ফরীদি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিলেন তিনি। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যচর্চার পুরোধা ব্যক্তিত্ব নাট্যকার সেলিম আল দীনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন তিনি। ১৯৭৬ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নাট্য উত্সব আয়োজনেরও প্রধান সংগঠক ছিলেন ফরীদি। এ উৎসবের মধ্য দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্গনে তার ব্যাপক পরিচিতি গড়ে ওঠে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তিনি ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ঢাকা থিয়েটারের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশে একজন মেধাবী ও শক্তিমান নাট্যব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন তিনি। বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সদস্য হিসেবে তিনি গ্রাম থিয়েটারের চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন।

আশির দশকের শুরুতে হুমায়ুন ফরীদি প্রথম বিয়ে করেন। হুমায়ুন ফরীদির প্রথম সংসারে দেবযানী নামের এক কন্যা সন্তান রয়েছেন। এরপর তিনি অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফাকে বিয়ে করেন। ২০০৮ সালে সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গেও তাঁর বিচ্ছেদ হয়ে যায়। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে হুমায়ুন ফরীদি ছিলেন দ্বিতীয়।

ফরীদি অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে আছে, ‘ভণ্ড’ ‘শ্যামল ছায়া’, ‘জয়যাত্রা’, ‘আহা!’, ‘হুলিয়া’, ‘একাত্তরের যিশু’, ‘দহন’, ‘সন্ত্রাস’, ‘ব্যাচেলর’ প্রভৃতি। উল্লেখযোগ্য টিভি নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘নীল নকশার সন্ধানে’ (১৯৮২), ‘দূরবীন দিয়ে দেখুন’ (১৯৮২), ‘ভাঙনের শব্দ শুনি’ (১৯৮৩), ‘ভবের হাট’ (২০০৭), ‘শৃঙ্খল’ (২০১০) প্রভৃতি। বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ধারাবাহিক ‘সংশপ্তক’ নাটকে ফরীদির অনবদ্য অভিনয়ের কল্যাণে ‘কান কাটা রমজান’ চরিত্রটি তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

রাজধানীর মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন হুমায়ুন ফরীদি।


এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। ebizctg.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে ebizctg.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।