আহা আজি এ বসন্তে

0

বসন্ত ঋতুকে নিয়ে কবিরা লিখেছেন অনেক কবিতা। গায়কেরা গেয়েছেন অজস্র গান। তাদের রচিত সেসব কবিতা আর গানে বসন্তের অপরূপ রূপ প্রকাশ পেয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘আজি দখিন-দুয়ার খোলা/ এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত এসো। প্রেমের কবি নজরুল লেখেন, এলো খুনমাখা তূণ নিয়ে/ খুনেরা ফাগুন।’ বসন্ত আমাদের মনে শিহরণ তোলে। সেইসঙ্গে ফাগুনের আগুন লাগে বনেও। রূপ লাবণ্যে জেগে উঠেছে প্রকৃতি। গাছের পাতা আর ফুলে আলোর নাচন। কোকিলের কুহুতান। সবই জানিয়ে দিচ্ছে আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে।

‘ফাগুন, হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান–/তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান/ আমার আপনহারা প্রাণ আমার বাঁধন-ছেড়া প্রাণ। ‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনায় প্রকৃতি ও ঋতু ধরা দিয়েছে বহুরূপে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসন্তকে ভৌগোলিক অবস্থানের ছকে আবদ্ধ রাখেন নাই। যেমন ‘নব বসন্তে নব আনন্দ/ উৎসব সব/ কত দিকে কত বাণী/ নব নব কত ভাষা/ ঝর ঝর রসধারা।’

কাজী নজরুলের গানেও নতুন রূপ নিয়ে যেন বসন্তের আগমন ঘটে। তিনি লিখেছেন,
‘আসে বসন্ত ফুলবনে/সাজে বনভূমি সুন্দরী/ চরণে পায়েলা রুমুঝুমু/ মধপ উঠেছে গুঞ্জরি।’
ফাগুনের রুপ রসে মুগ্ধ হয়ে তিনি আরোও লেখেন, ‘আজি দোল ফাগুনের দোল লেগেছে/ আমের বোলে দোলন-চাঁপায়।’

কবি ফররুখ আহমেদের ফাল্গুনে শিরোনামের কবিতাটি আমরা ছোট বেলায় পড়ে পড়ে মুখস্ত করে ফেলেছি। বসন্ত আর প্রকৃতির প্রতি তার ভালবাসার নিদর্শন পাওয়া যায় এই কবিতায়, ‘ফাল্গুনে শুরু হয় গুনগুনানী/ ভোমরাটা গায় গান ঘুম ভাঙানি/ এক ঝাঁক পাখি এসে ঐকতানে/ গান গায় এক সাথে ভোর বিহানে।’

জীবনের কবি জীবনানন্দের কবিতায় বসন্ত স্বরূপে এসেছে, কবিতার ছত্রে ছত্রে বলে দিচ্ছে তিনিও নীরবে নিগুড় বসন্ত প্রেমিক। তার কবিতায় বার বার এসেছে বচন্তের কথা। ‘সবিতা’ কবিতায় জীবননানন্দ বসন্তকে তুলে ধরেছেন এভাবে ‘সবিতা, মানুষ জন্ম আমরা পেয়েছি/মনে হয় কোন এক বসন্তের রাতে/ ভূমধ্যসাগর ঘিরে সেই সব জাতি/ তাহাদের সাথে/ সিন্ধুর আঁধার পথে করেছি গুঞ্জন।’

আবার কবি সুভাস মুখোপাধ্যায়ের কবিতার খাতায় তাই উঠে আসে-‘ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক আজ বসন্ত’র মতো কবিতা।

কবি মহাদেব সাহা আবার বসন্তকে কবির সাথে তুলনা করে বলেন, ‘বসন্তকে আমি বলি কবি, তার হাতে রচিত হয়/ পৃথিবীর প্রেমের কবিতা’

আমাদের বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম গেয়ে ওঠেন ‘বসন্ত বাতাসে সই গো/ বসন্ত বাতাসে/ বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে।‘

বসন্ত এলে আমাদের মন উচাটন হয়ে ওঠে। কুমার বিশ্বজিৎ আধুনিক গানে বসন্ত প্রেমের উতলা হাওয়া বইয়েছেন ‘যেখানে সীমান্ত তোমার/ সেখানে বসন্ত আমার/ ভালোবাসা হৃদয়ে নিয়ে/ আমি বারে বার আসি ফিরে/ ডাকি তোমায় কাছে।’

বসন্ত বাংলা সাহিত্যের যেমন আছে তেমনি আছে বাংলা ছায়াছবিতেও। ‘আইল দারুন ফাগুনরে, লাগলো মনে আগুনরে, একা একা ভালো লাগে না।’ বসন্তে প্রিয় মানুষটিকে কাছে না পাওয়ায় যন্ত্রণা এভাবেই ধরা দিয়েছে বাংলা ছায়াছবিতে।

ওপার বাংলা সাহিত্যেও ফাগুনের অনেক কবিতা আছে, আছে গান, যেমন- ‘ফাগুনের মোহনায় মন মাতানো মহুয়ায়/রঙ্গিনী বিহুর নেশা কোন আকাশে নিয়ে যায়।’

‘আকাশে বহিছে প্রেম, নয়নে লাগিল নেশা/ কারা যে ডাকিল পিছে! বসন্ত এসে গেছে/ মধুর অমৃত বাণী, বেলা গেল সহজেই/ মরমে উঠিল বাজি; বসন্ত এসে গেছে।’ চতুষ্কোণ ছবিতে অনুপম রায়ের সুরে এই গানটিও মোটামুটি আজকাল সবার কাছে অনেকটা জনপ্রিয়।

বসন্তকে নিয়ে যেমন আছে আনন্দ উচ্ছাস তেমনি আছে বিরহের সুর। যারা এই বসন্তে তাদের মনের মানুষ থেকে দূরে আছেন তাদের জন্যে লেখা গান, “কেউ বলে ফাল্গুন, কেউ বলে পলাশের মাস/ আমি বলি আমার সর্বনা/ কেউ বলে দখিনা কেউ বলে মাতাল বাতাস/ আমি বলি আমার দীর্ঘশ্বাস।’

বাঙালি বসন্তকে জড়িয়ে রাখেন হৃদয়ের খুব কাছে। বসন্তে মেতে উঠেন নানা আনন্দ-উৎসবে। আর এসকল বসন্তের উৎসবে আলো ছড়ায় বসন্তের গান ও কবিতা। ‘সুখে আছে যারা/ সুখে থাক তারা/সুখের বসন্ত/ সুখে হোক সারা। ‘কবিগুরুর এই পঙ্কতিই হোক আমাদের এই বসন্তের স্লোগান।


এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। ebizctg.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে ebizctg.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।