জিয়াউর রহমানের ‘যোগ্য’ ছেলে তারেক রহমান

0

।। শেখ আদনান ফাহাদ ।।

সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের ‘যোগ্য’ সন্তান হিসেবে নিজেকে ভালোভাবেই প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন লন্ডনে পালিয়ে থাকা তারেক রহমান। জিয়াউর রহমান একজন সেক্টর কমান্ডার হয়ে, একজন ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হয়ে ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার অন্যতম নির্দেশদাতার ভূমিকা পালন করেছিলেন। আর তারেক রহমান পালিয়ে থাকা অবস্থায় দুর্নীতি মামলায় আদালতের রায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে লন্ডনে নিজ দেশের হাইকমিশনে হামলা করিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর ছবিকে প্রকাশের অযোগ্য পন্থায় নিজের ক্যাডারদের দ্বারা অবমাননা করিয়েছেন। এর আগে ২০০৪ সালে ২১ শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে শেষ করে দেয়ার নির্মম চক্রান্তেও তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ হাত ছিল মর্মে মামলা আদালতে প্রক্রিয়াধীন আছে।

দুইটা নতুন অপরাধ করেছেন তারেক রহমান ও তার উন্মাদ সমর্থকরা। প্রথমত, লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে তারেকের ক্যাডার বাহিনী। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের জাতির জনককে অত্যন্ত দৃষ্টিকটু আর অশালীনভাবে অবমাননা করেছে এই অসভ্য বাংলাদেশীগুলো। ঘটনাস্থল থেকে এক বিএনপি নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে ব্রিটিশ নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ। গ্রেপ্তার হওয়া বিএনপি নেতা জানিয়েছেন, তারেক রহমানের নির্দেশেই তারা এই পরিকল্পিত হামলা করেছেন। বাংলাদেশের আদালতে হওয়া একটা বিচারের সাথে হাইকমিশন কিংবা বঙ্গবন্ধুর কী সম্পর্ক? বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগের উপর দাঁড়িয়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। সেই মহান ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে অপমান করিয়েছেন তারেক রহমান।

বঙ্গবন্ধু কে ছিলেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পেছনে এই মহান মানুষটির কী অবদান, কী তাঁর আত্মত্যাগ, এর কোনো খবরই কি লন্ডনের উন্মাদ ছাত্রদল-শিবিরের ছেলেরা জানে না? কেমন রক্ত এদের শরীরে? কাদের ঘরে এদের জন্ম? পুরো পৃথিবী যেখানে শেখ মুজিব নামটি শুনলে কুর্নিশ করে, সেখানে কী করে লন্ডনের মত ‘সভ্য’ শহরে আমাদের জাতির জনকের ছবিকে নির্মমভাবে অপমান করে কিছু বাংলাদেশী পরিচয়ধারী? যে সবুজ পাসপোর্ট ব্যবহার করে এই বাংলাদেশিরা লন্ডনে থাকার প্রক্রিয়া সম্পাদন করেছেন, সে পাসপোর্ট কীভাবে আসল, এই রাষ্ট্রের জন্ম কীভাবে হল, এর কোনো ইতিহাসই কি এই অকৃতজ্ঞরা জানেনা?

জিয়াউর রহমানের স্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে এতিমের টাকা মেরে খাওয়ার অপরাধে ৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। শুধু খালেদা জিয়া নয়, তারেক রহমান ও মামলার অন্যান্য আসামীকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। বিএনপি-জামাতের সমর্থকদের বিশ্বাস, সরকার আদালতের উপর ‘প্রভাব’ খাটিয়ে খালেদা জিয়ার বিপক্ষে রায় এনেছে। আদালতকে কোনো রাজনৈতিক প্রভাবে সিদ্ধান্ত নিলে চলে না। আদালত দেখে প্রমাণ। খালেদা জিয়ার বিচার আইনের শাসনকে সমুন্নত রেখেছে বলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি স্বস্তি প্রকাশ করেছে। খালেদা জিয়ার পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ শুধুমাত্র যে বাংলাদেশের আদালতে প্রমাণিত হয়েছে, তা নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদালতেও তারেক রহমানদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এফবিআই রিপোর্ট প্রদান করেছে। নিশ্চয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদালত কিংবা এফবিআই আওয়ামীলীগের কথায় চলে না।

যাই হোক, খালেদা জিয়ার কারাগারগমন পুরো বাংলাদেশের জন্যই অস্বস্তির। সাবেক প্রধানমন্ত্রী এতিমের কথা বলে টাকা এনে তসরুপ করবেন এটা বাঙালি হিসেবে আমাদের লজ্জার। বিশেষ করে বিএনপি-জামাত সমর্থকরা এটা মেনে নিবেন না, এটা স্বাভাবিক। তাদের মনে কষ্ট লাগবে। আদালতে যুক্তি-তর্ক দিয়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা তাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলেই তো শাস্তি দিয়েছেন বিজ্ঞ আদালত।

বিএনপি-জামাতের অধিকার আছে ক্ষুব্ধ হওয়ার। রাজনীতির নামে উল্টাসিধা কথাও তারা বলতে পারেন। শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বের বহু উন্নত দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতির নামে আপত্তিকর কথাবার্তা বলা হয় হরহামেশা। কিন্তু লন্ডনে তারেক জিয়ার অনুসারীরা অসভ্যতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন। আমাদের জাতির পিতার ছবিকে এভাবে অপমান করবে এদেশেরই কিছু মানুষ? বিদেশের মাটিতে নিজ হাইকমিশনে এভাবে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাও বোধহয় এই প্রথম। এই হামলাকারীরা কি মানসিকভাবে সুস্থ? তারেক রহমান এদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতা। মা কারাগারে যাওয়ায় ইতোমধ্যে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব নিয়েছেন। এত বড় দলের নেতা হয়ে তারেক রহমান কী করে নিজ দেশের হাইকমিশনের হামলার নির্দেশ দিতে পারেন! খালেদা জিয়া মুরুব্বী হয়ে মাথা ঠিক রেখেছেন। কারাগারে যাওয়ার আগে নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন, তারা যেন শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। কিন্তু তারেক রহমান মায়ের নির্দেশ অমান্য করে সন্ত্রাসী হামলার পথেই রইলেন। তবে কি খালেদা জিয়া দলের উপর কমান্ড হারিয়েছেন? তারেক রহমানই এখন সর্বেসর্বা?

আদালতের রায়ে তারেক রহমান ক্ষুব্ধ হতে পারেন। কারণ মায়ের কারাগার গমন কোনো ছেলের পক্ষে মেনে নেয়া কঠিন। কিন্তু তিনি কেন বঙ্গবন্ধুকে অপমান করালেন, তিনি কেন বাংলাদেশ হাইকমিশনে হামলা করালেন? তারেক রহমানের সাম্প্রতিককালের কথাবার্তা শুনে মনে হয় তিনি স্বাধীনতা-বিরোধী জামাতের হয়ে কাজ করছেন। বিএনপিতে এখনো অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন, ছাত্রদলের অনেক নেতা-কর্মী এখনো শিবিরকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করেন। তারেক রহমান সম্ভবত ছাত্রদল আর শিবিরের মধ্যে কোনো বিভাজন রাখতে চান না। তারেক রহমান ঘুরে ফিরে নানা বক্তৃতা-বিবৃতিতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করেন, বঙ্গবন্ধুকে কটাক্ষ করে কথা বলেন। কিছু বক্তৃতা স্টাডি করে দেখা গেছে, বিতর্কিত নিন্দিত বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহারের সাথে তারেক রহমানের অনেক কথার মিল আছে।

বছর কয়েক আগে ফরহাদ মজহার লন্ডনের ওয়াটার লিলি গার্ডেনে একটি দীর্ঘ বক্তৃতায় আওয়ামী লীগশূন্য, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিশূন্য বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের সাথে জড়িত ছেলে-মেয়েদের তিনি উন্মাদ বলে বর্ণনা করে কীভাবে হেফাজতে ইসলাম নামের আন্দোলন সংঘটিত করেছিলেন তার বিশদ বর্ণনা দিয়েছিলেন। তিনি লন্ডন থেকে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার ডাক দিয়েছিলেন। ফরহাদ মজহারের পুরো বক্তব্য আমার কাছে আছে। বঙ্গবন্ধুকে অত্যন্ত অপমানজনক ভাষায় বর্ণনা করেছিলেন ফরহাদ মজহার। ছাত্রদল এবং শিবিরের শত শত ছেলের সামনে ফরহাদ মজহার মূলতঃ ‘ইসলামি বিপ্লবের’ ডাক দিয়েছিলেন। জামাতের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে বসবাস করছেন। জামাত-শিবিরের বড় বড় নেতারা লন্ডনে দীর্ঘদিন অবস্থান করছেন। তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে লন্ডনে একটি বিশাল চক্র গড়ে উঠেছে। তারেক রহমান হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এমন সব বক্তৃতা-বিবৃতি দিচ্ছেন, যা শুনে আমরা শুধু ক্ষুব্ধই হচ্ছি না, আতঙ্কিত হচ্ছি। বাংলাদেশের পুরো ইতিহাসই তিনি বদলে দিতে চাইছেন। বিএনপি একটি বড় শক্তি। এত বড় শক্তিকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তারেক রহমান এবং বাংলাদেশকে বড় মূল্য দিতে হতে পারে। মিথ্যা তথ্য আর সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে কোনোদিন কল্যাণজনক কিছু হতে পারে না।

দেশের মানুষকে বোকা মনে করার কোনো কারণ নেই। দেশের মানুষই আওয়ামী লীগকে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে ক্ষমতায় এনেছে। বিএনপি-জামাতের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ভালোভাবে নেয়নি সাধারণ মানুষ। ২০১৩-২০১৫ সালে দেশব্যাপী পেট্রল বোমা সন্ত্রাস চালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল বিএনপি-জামাতের লোকজন। এর পরিণামে দেশের মানুষ আরও বেশি করে ঘৃণা করতে শুরু করে তাদের। সামনে নির্বাচন। নতুন বছরে তারেক রহমান আবারো বড় অপরাধ করলেন। নিজ দেশের হাইকমিশনে হামলা চালিয়েছেন, সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত জাতির পিতাকে বিদেশের মাটিতে অপমান করেছেন।

তারেক রহমান কি তার বাবার মত ষড়যন্ত্রের পথ অনুসরণ করছেন? ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার কাজ এখনো শেষ হয়নি। সেদিন শেখ হাসিনাকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন বিএনপি-জামাতের মদদপুষ্ট জঙ্গিরা। শেখ হাসিনাকে হত্যার এ পর্যন্ত ২০ বার চেষ্টা করেছে বিরোধী শক্তি। কিন্তু আল্লাহ শেখ হাসিনাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। শেখ হাসিনা তাঁর মত করে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। খালেদা জিয়ার উপর একবারও কোনো সন্ত্রাসী হামলা হয়নি। কারা হামলা করে, কী জন্য হামলা করে এটা দেশের মানুষ সহজেই বুঝতে পারে।

তারেক রহমানের বাবা জিয়াউর রহমানও ষড়যন্ত্রের পথে, গুপ্তহত্যার পথে হেঁটেছিলেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর খুনিরা জিয়াউর রহমানের সাথে দেখা করে তার সমর্থন কামনা করেন। জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘আমি সিনিয়র অফিসার হয়ে, সরাসরি এই কাজ করতে পারি না, তোমরা জুনিয়র অফিসাররা করতে চাইলে কর, গো এহেড।’ এ সংক্রান্ত ভিডিও ডকুমেন্ট সংগ্রহ করতে গবেষক হওয়া লাগে না, ইউটিউবে যথাযথ শব্দ লিখে সার্চ দিলেই পাওয়া যায়। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের তথা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শত শত সিপাহী আর অফিসারকে হত্যা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। তদুপরি, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রক্ষা করতে ইন্ডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন। গোলাম আযমকে পাকিস্তান থেকে ফিরিয়ে এনে তাকে এবং জামাতকে পুনর্বাসন করেছিলেন। বর্তমান আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সহচর, স্বৈরশাসক হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদের আমলেও যুদ্ধাপরাধী ও রাজাকারসহ স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির পুনর্বাসন অব্যাহত থাকে।

‘গণতান্ত্রিক’ বাংলাদেশে বিএনপির গত দুই দফার শাসনামলে একই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ থাকে। গোলাম আযম, আলী আহসান মোজাহিদ, মতিউর রহমান নিজামিদের মত মানবতাবিরোধী অপরাধীদের খালেদা জিয়া রাষ্ট্রীয় নানা পদে অধিষ্ঠিত করেছেন। খালেদা জিয়ার এই নীতির সুযোগে জামাত দিন দিন নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছে, পাশাপাশি দেশে জঙ্গিবাদ বিস্তার লাভ করেছে। নিজ দেশের হাইকমিশনে হামলা চালিয়ে তারেক রহমান প্রমাণ করলেন, সন্ত্রাসের পথেই আছেন তিনি। শেখ হাসিনার সরকার বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার করেছেন আইনের ধারায়, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে। দেশের মানুষ নিশ্চয় তাই এই আইন আর বেআইন, শান্তি আর ধ্বংসের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারে।

* শেখ আদনান ফাহাদ এর অন্য লেখাগুলো পড়তে ক্লিক করুন

লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। ebizctg.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে ebizctg.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply