‘কানে ভাসে, শেষ শেষ, বাংলাদেশ, বাংলাশেষ…’

0

।। অমি রহমান পিয়াল ।।

জিয়াউর রহমান উর্দি ছাইড়া সাফারি ধরার আগে কয়েকটা ধাপের মধ্যে দিয়ে গেছে বাংলাদেশের রাজনীতি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর এই ধাপগুলা অতিক্রম করতে হ্ইছে তাকে। সফিউল্লাহকে সরাইয়া সেনাপ্রধান হওয়ার আগে খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের খুনীবান্ধব ও বিশ্বাসঘাতক অংশটাকে দিয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রাথমিক পি মারা সারা হইছে। সে সময় রাজনৈতিক দল বলতে ছিলো আওয়ামী লীগ, সিপিবি আর ন্যাপ মোজাফফর নিয়া গঠিত বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আ্ওয়ামী লীগ, বিরোধী দলে ছিলো জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল এবং ন্যাপ ভাসানী। জামায়াত, মুসলিম লীগ পিডিপি নেজামে ইসলামী যথারীতি নিষিদ্ধ। বাকশাল বাতিল না করায় সিপিবি আর ন্যাপ মোজাফফর আলাদা হইতে পারতেছিলো না। তবে রাজনৈতিক কার্যক্রমও চালানোর উপায় ছিলো না। বঙ্গবন্ধু অনুগতদের একটা বড় অংশই তখন কারাগারে কিংবা পলাতক। বঙ্গবন্ধুর নাম নেওয়া নিষিদ্ধ করলো মোশতাক। তার সব ছবি হটানো হইলো, কারও কাছে পাওয়া গেলে তারে জেলে ঢোকানো হবে বলা হইলো। বিটিভি থেকে সব ফুটেজ সব ভাষণ হাপিশ করা হইলো।


ছবি: জিয়া ও মুশতাক- দু’জন দু’জনার

খালেদ মোশাররফ তার পাচদিনের সেনাপ্রধান জীবনে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে বের হন নাই। জিয়া গৃহবন্দী, বাইরের লাইন কাটা হইলেও বেডরুমে টেলিফোন সংযোগ আছে। তারে বাচানোর ঠিকা নিয়া তাহের মুভ করলেন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা নিয়া। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডেও এদের একাংশ ব্যবহৃত হইছে। যদিও বলা হয় একদল বিপথগামী সেনা অফিসারের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান হইছিলো, খুনী তালিকায় রিসালদার আর হাবিলদারদের উপস্থিতি জানান দেয় দাবিটা সঠিক নয়। একই পদবীর খুনী জেলখানায় ঢুকে মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের নেতৃত্বে থাকা জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করছে। প্রচুর মুক্তিযোদ্ধা অফিসার এবং খালেদ মোশাররফকে হত্যা করা হলো, জিয়া আবার সেনাপ্রধান হলেন। কথিত এই সিপাহী জনতার বিপ্লবে তাহেরের এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে একদমই অন্ধকারে ছিলো জাসদ। কারণ ঘটনার দুইদিন আগে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে আয়োজিত বিশাল মিছিলটি হয় তাদের অংশগ্রহণে খালেদ মোশাররফের মা এবং ভাই রাশেদ মোশাররফকে সামনে রেখে। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থারে গণবাহিনীর অংশ ভাবা জাসদ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিপদে পড়লো।

জিয়া সেনাপ্রধান হিসেবে তার ডিসিপ্লিন ফেরানোর অভিযাত্রা শুরু করলেন প্রিয় তাহেরকে কোরবানি দিয়া। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের আগে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি এবং নভেম্বরে সেনাবাহিনীতে বিশৃংখলা সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশ বেতারে সরাসরি সম্প্রচারিত এক ভাষণে জাসদকে জাতীয় শত্রু হিসেবে আখ্যায়িত কইরা নির্মূলের ঘোষণা দিলেন তিনি। খন্দকার মোশতাকের প্রেসিডেন্ট হ্ওয়ার খায়েশ ততদিন পুরাই মিট্যা গেছে, বিচারপতি সায়েম কিছুদিন গদিতে বইসা বাকি দাপ্তরিক কাজগুলা সারলেন। মোশতাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য করা দালাল আইন বাতিল এবং বঙ্গবন্ধুর খুনীদের রক্ষাকবচ হিসেবে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করছিলেন। নভেম্বরেই জামাতের সব নেতা কারাগার থেকে বের হইয়া আসলো। রক্ষীবাহিনীরে সেনাবাহিনীতে আত্মীভূত করছিলেন জিয়া। একই আদলে গড়া বিশেষ আধাসামরিক মিলিশিয়ারা দেশ জুড়ে জাসদ নিধন শুরু করলো। তাগো লগে হাত মিলাইলো সর্বহারা পার্টি। তাহের ঝুললেন। তারে ঝোলানোয় বিশেষ কাজে আসলো সিআইএর স্পেশাল অপারেটর পিটার কাস্টার্সের জবানবন্দি। একমাত্র বিদেশী হিসেবে দেশবিরোধী চক্রান্তের এই মামলায় তারে চৌদ্দ বছর জেলের হুকুম দেওয়া হইলেও ওইটা কাগজে কলমে। পাখি মিশন কমপ্লিট কইরা সোজা আমস্টারডামে। তারে রিসিভ করলো ডালিম, রশীদ, মহিউদ্দিন। বিভিন্ন দেশে থাকলেও এইখানে মহিউদ্দিনের একটা কাফেতেই তাগো রিইউনিয়ন চলে কিছুদিন পরপর। কাস্টার্স তাদের অভিভাবক।


ছবি: খালেদ মোশাররফ

সবচেয়ে মজা লাগে যখন বিএনপি নেতারা হাজার হাজার জাসদ মারার জন্য বঙ্গবন্ধু আর রক্ষীবাহিনীরে দায়ি করে। প্রয়াত বেবি মওদুদ এক হিসাবে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে নিহত জাসদ কর্মীদের মোট সংখ্যা বের করছিলেন ১০৩ জন। তাও তা জাসদের বিভিন্ন প্রকাশনী লিফলেট প্রচারপত্র এবং পত্রিকা গণকণ্ঠের হিসাব অনুসারে। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে মেজর জলিল আর আসম রব স্বাক্ষরিত প্রচারপত্রে বলা হইছে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে তাদের শতাধিক কর্মী হত্যা করা হইছে। শতাধিক মানেও একশর সামান্য বেশী বোঝায়। ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউর ছাপানো কয়েকটা প্রতিবেদন অনুসারে হাজার হাজার জাসদ কর্মীরে বিনা বিচারে দেখা মাত্র গুলি করে হত্যা করা হইলো। আওয়ামী লীগ এর একশো ভাগের একভাগও মরে নাই জিয়ার হাতে যতটা জাসদ মরছে। ফেরারি অবস্থা থেকে আলোতে মুখ দেখানো জামায়াত নেতারা জাসদের জামা খুইলা মাথায় টুপি লাগানোর আগে নিকটস্থ সেনা অফিসে ফোন কইরা জানান দিতে থাকলো তার এতদিনকার কমরেড কোথায় লুকায়া আছে। মরার আগে কমরেড জানতেও পারলো না এতদিন তার লগে এত বীরত্ব দেখায়া পাটের গুদামে আগুন দেওয়া, ব্যাংক লুট করা, থানা লুটার সময় পুলিশ মারা মালটা আলবদরের সদস্য ছিলো।

একাত্তরের মতো রাজনীতি নিষিদ্ধ হইলেও ইসলামী জলসা ও ওয়াজের উপর কোনো বিধিনিষেধ ছিলো না। এইটার আড়ালে দেশজুড়ে সংগঠিত হওয়া শুরু করলো সব রাজাকার আলবদর। ১৯৭৬ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক ইসলামী মাহফিল আয়োজনের মাধ্যমে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পনের শোধ তুললো তারা (পরে জিয়া ওইটারে বাচ্চাদের খেলাধুলার জন্য শিশুপার্ক বানায়া দিছিলেন)। লিবিয়া এবং পাকিস্তানী রাষ্ট্রদূতের উপস্তিতিতে দেলোয়ার হোসেন সাঈদি পরিচালিত ওই মাহফিলে দাবি উঠলো জাতীয় পতাকা বদলের। তারা চাঁদ তারা পতাকা চায়। দাবিটা জানানো হ্ইলো তোয়াবরে। পাকিস্তান বিমান বাহিনীর এই বাঙালি অফিসাররে জার্মানি থেকে আনায়া এয়ার কমোডর বানাইছিলেন জিয়া। বেটা ফারুক রশীদদের ফিরায়া জিয়ারে উৎখাতের স্বপ্ন দেখতেছে এই তথ্য ভ্যারিফাই হইতে না হইতে এই দাবি? পাছায় লাথি খেয়ে বাংলাদেশ ছাড়লো তোয়াব। নো সিনিয়র অফিসার, নো মুক্তিযোদ্ধা অফিসার টু চ্যালেঞ্জ হিম। মইরা সাফ সব। বঙ্গবন্ধুর খুনীরা সব বিদেশ। ক্ষমতার ভাগ চাইছিলো তারা কিন্তু ডিপ্লোম্যাট বানায়া তাগো ফেরারি জীবন থিকা মুক্তি দেওয়া হইলো ইনডেমনিটি অর্ডানেন্সের ছাতা ধইরা। এক ফারুক ভোদাই তাও চেষ্টা করছিলো। তার বাপ আর বোন টেলিফোনে অনুরোধ কইরা বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট থিকা ফারুকরে আবার প্লেনে উঠাইলো। যাওয়ার পর ল্যান্সারস নামের বিষফোঁড়াটারে সেনাসদর থেকে ডিলিট মারলেন জিয়া।

ফিল্ডে কেউ নাই। এ্ক বুড়া ভাসানী যিনি বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের সূর্যসন্তান বইলা আপ্লুত এক বাণী দিছিলেন তোষামোদি বয়ানে। নব্বই উর্দ্ধ ভাসানীরে ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চ করাইলেন ভারতরে হুমকি দিতে। বুঝতে হইবো তখন সব আব্বারা আছে পাশে। পাকিস্তান চীন সৌদিআরব এবং দাদাজান আম্রিকা। ভাসানী তো আর হালফ্যাশনের প্রাডো আর পাজেরো চইড়া লংমার্চ করতেন না, চীনের চেয়ারম্যানের নিয়মেই করতেন। নব্বই উর্দ্ধ বুড়া হাড়ে আর সইলো না, টেঁসে গেলেন। ভাসানী অনুগতরা কয় তিনি নাকি মৃত্যুশয্যায় জিয়ারে ডাইকা বলছিলেন তোমরা মুজিবররে ছোট কইরো না, ওরে গালি দিও না। জিয়া নাকি ভাসানীর কানে কানে কি একটা বলে চলে আসছিলেন। ভাসানীর চেহারা প্রথমে ফ্যাকাশে তারপর লাল হইলো। একদম জীবনের শেষ প্রান্তে আইসা এমন অশ্লীল একটা গালি শুনতে হবে কল্পনাও করেন নাই তিনি। ডিটোরিয়েট করলো তার অবস্থা। ওই অপমান নিয়াই চইলা গেলেন।

এরপর ন্যাপের সবাইরে ডাইকা জিয়া কইলেন ডোন্ট ওরি। ৭ নভেম্বর বিপ্লবে তোমাদের ভূমিকা আমি ভুলি নাই। তোমরা না থাকলে জাসদরে পল্টিটা দেওয়া সম্ভব হইতো না। তো তোমাগো অভিভাবক এখন থিকা আমি। আমারেই আব্বা ডাকবা। মওলানারে কানে কানে তাই কইছি আমি। শুইনা খুশীতে উত্তেজিত হইয়া হার্টফেল করছে বেচারা। তো তোমরা গুছগাছ করো। আমার বিরুদ্ধে দাড়ানোর মতো হ্যাডমওয়ালা কেউ নাই এখন সেনাবাহিনীতে। (মনে মনে কইলেন নতুন সেনাপ্রধানের একটু আলুর দোষ আছে, তার আলু সাপ্লাই ঠিকঠাক রাখতে হইবো আর খিয়াল রাখতে হইবো মইনুল রোডের আশেপাশে যাতে না আইতে পারে। ঘরে কাউরে না বলতে পারে না এক আপোষহীন আছে।) তো গুছাও তোমরা। আমি রাজনীতিতে নামবো। শায়েরি স্টাইলে আরও কইছিলেন আমি পলিটিশিয়ানগো বলাৎকার করুম এমন বলাৎকার যে রাজনীতি করা কঠিন হইয়া যাবো। উপস্থিত মশিউর রহমান, কাজী জাফর আর অন্যরা উর্দু তেমন বুঝে না, তাও আবার পাঞ্জাবি মেশানো উর্দু। এনায়েতুল্লাহ খান অনুবাদ কইরা দিলো, জিয়া সাব কইছেন তিনি বাকিগো লাইগা পলিটিক্স ডিফিকাল্ট কইরা দিবো যাতে তোমরা ইজিলি করতারো।

একদম অভিভাবকহীন ফ্রি রোমিং কেমন সমস্যার জন্ম দেয় তা সাদ্দাম আর গাদ্দাফিরে দিয়া অনেক পরে বুঝছে সিআইএ। কিন্তু আইএসআই অনুমান করছে আগেই। কোনো ঝুকি নেয় নাই। তারা তো জানে দেশের ক্ষমতা দখল ছাড়া আর কোনো যুদ্ধজয়ে ব্যর্থ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জেনারেলগো মন। জিয়াতো মিঠারই প্রোডাক্ট। অতএব তুলনামূলক ইয়াং গোলাম আযমরে পাঠানো হইলো। আযম কিছু কইলেই পাসপোর্ট দেখায়া কইতো দেখ বেটা, আমি পাকিস্তানী। আমারে ঝাড়ি লবি না। রাজনৈতিক দলগুলারে বলা হ্ইলো নতুন করা নিবন্ধন করতে হইবো, জিয়ার দেয়া শর্তানুসারে। মোশতাক বানাইলো ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক লিগ। জামাত আর নেজামে ইসলামী কইলো থাক তোমরা নাস্তিকগো লগে রাজনীতি করছো। আমরা আলাদা দল করুম। তারা করলো একটা কয়দিন পর আবার ভাঙলো। মওলানা রহিম জামাতরে খাড়া করাইলো। গোলামরে দেখতে পারে না সে, সবাইরে রাইখা পাকিস্তান পলাইছিলো বইলা। কিন্তু উপায় নাই।

বু্ইড়ারা ছাত্র রাজনীতি করতে পারবো না এই হারাম ফতোয়া বাতিল কইরা ইসলামী ছাত্র সংঘ ইসলামী ছাত্র শিবির নামে আত্মপ্রকাশ করলো। প্রেসিডেন্ট হইলো চট্টগ্রামের কুখ্যাত আলবদর প্রধান মীর কাশেম আলী। জিয়া রেডিওতে শোনেন প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ। গলা মিলান শেষ বাংলাদেশ। শেষ শেষ। বউ আইসা বলে আপনি যাওয়ার আগে রেডিওটা দিয়া যাইয়েন। বিজ্ঞাপন তরঙ্গ শুনবো। জিয়া বলেন, তুমি বাংলা বুঝো নিকি? তার স্ত্রী লাজুক হাসি দিয়া বলেন, বাংলা তো আর আগের বাংলা নাই এখন অনেক সহজ হইয়া গেছে। রুনা লায়লা ফিরছে জাভেদ এফডিসির বস। সিনেমার ডায়লগে আর গানে শুরু হইছে ব্যাপক ইসলামিক (উর্দু) শব্দের ব্যবহার। দ্য রেইনে করাচি ফেরত অভিনেত্রী অলিভিয়া একটু খোলামেলা হইলেও সেটা উর্দু ভার্সনে পাকিস্তানেও মুক্তি পাইছে। ব্যাপক হিট। বাংলার নারীরা তাদের জন্য আগের মতোই উদার বইলা সিগনাল মিলছে। ইমরান খান তখনও ঢাকায় পা রাখে নাই, শহীদ আফ্রিদিও জন্ম নেয় নাই। তবে ক্ষেত্র প্রস্তুত হইয়া গেছে। জিয়া শুইনা উৎফুল্ল চিত্তে সাফারির বোতাম লাগান, আর গান শেষ শেষ বাংলাদেশ, প্রথম বাংলাদেশ আমার হাতে শেষ। বাংলাশেষ বাংলাশেষ বাংলাশেষ…

এরপর কাহিনী চমৎকার। সামরিক বলাৎকারের এক রাজনৈতিক প্রদর্শনী। দল বাইন্ধা সব চিংকু ভাসানীর ন্যাপ ছাইড়া গড়লো নতুন দল জাগদল। জাতীয় গণতান্ত্রিক দল। জিয়া তাগোরে ডাকলেন। চুদির ভাই কথাটার পাকিস্তানী প্রতিশব্দ বাহেনচোদ ব্যবহার কইরা বললেন জাগদল কিরে? জাতি কি দল চালাইবো? তারা শাসিত হইবো। দল চালামু আমি। আমিই বাংলাদেশ, প্রথম আর শেষ। বদলা নাম। চিংকুরা রিস্কে গেলো না, কইলো কি নাম আপনিই কন হুজুর। জিয়ার মনে পড়লো পুরানো সব স্মৃতি। লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেমের কথা। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা যার ব্রেইন চাইল্ড। শেখ মুজিবরে না জড়াইলে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার জন্য তারই হিরো হওয়ার কথা। বাংলাদেশ শাসন করবো বাংলাদেশের আর্মি অফিসাররা, পাকিস্তানী আর্মি অফিসাররা না। এই ছিলো তার দর্শন। সব বাঙালী অফিসাররে একাট্টা করছিলেন। আর একটা রাজনৈতিক ফ্রন্ট খোলার ঘোষণা দিছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ পল্টন ময়দানে আত্মপ্রকাশ করার কথা ছিলো এই দলের। বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি। জিয়া বললেন, নাম হইবো বিএনপি। দেশে মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র আইকন তো আমি ছাড়া কেউ নাই। আমি ঘোষনা দিছি বইলাই তো দেশটা স্বাধীন হইছে। বিএনপি হইবো মুক্তিযোদ্ধাদের পার্টি, মুক্তিযুদ্ধের দল। আমাগো সহযোগী কারা হইবো এইটা পরে ঠিক হইবো। কারণ জামাতে ইসলামী ছাড়া আর কারও তো মুক্তিযুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা নাই। কোন বেয়াদপ জানি কইয়া বসলো হুজুর স্যর জেনারেল। কর্নেল ওসমানী সাব তো আছে। আপনাগো কমান্ডার। জিয়া সবাইরে গেট আউট কইরা বাইর কইরা দিলেন।

রাজনীতি শুরু হইলো। নির্বাচন হইলো। জিয়া প্রেসিডেন্ট হইলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ওসমানীরে হারাইয়া, বিপুল ব্যবধানে সেই ভোটে ঐতিহাসিকভাবে নির্ধারিত হইলো কে বেশী জনপ্রিয়। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পি মারাটা এমনই ছিলো যে ঘা টা ক্যান্সার হইয়া গেলো। জিয়ার সংসদে সবচেয়ে চমকপ্রদ দলটা আছিলো সাম্যবাদী দল। মালিকের নাম কমরেড তোয়াহা। বদ উমর একটু মনক্ষুন্ন হইয়া কইলো শ্লার সব তত্ব কইরা দিলাম আমি আর এমপি হইলো তোয়াহা! জিয়া স্বান্তনা দিলেন আপনে তো আর তার মতো সাহস কইরা চিত্রবাংলার প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে বলেন নাই যে দেশ থিকা জাসদ বিতরণে আমার ভূমিকা জিয়ারে মুগ্ধ করছে। গোলাম কইলো হামভি পলিটিক্স করমু। জিয়া কয় বাংলাদেশী পাসপোর্ট ছাড়াতো হইবো না। আবেদন করেন। চতুর্থবারের মতো গোলামের সেই আবেদন হোম মিনিস্ট্রি রিফিউজ করলো যেদিন একইদিন শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেন। কয়দিন পর সেনাঅভ্যুথানের মাধ্যমে জিয়ারে হত্যা করা হইলো। দায় নিয়া মরলেন আড়ালে চুপচাপ থাকা সেক্টর কমান্ডার মঞ্জুর। আলুর গুদামগুলার সুরক্ষা করতে দেশের দায়িত্ব নিলেন হোমো এরশাদ। জিয়া মরার আগে আইএসআই থিকা ফোন পাইছিলেন, গোলাম নাকি বিচার দিছে। রাজাকারগো নাকি যথাযথ সম্মান করা হইতেছে না রাজনীতিতে। জিয়া কইলেন শালে ঝুট বোলা। শাহ আজিজ আমার প্রধানমন্ত্রী, রাজনীতিতে ওর থিকা বুড়া রাজাকার কোন হালা!

বেগম কোনো প্রতিশোধের পথে হাটলেন না। স্বামীরে হত্যা করা হয় নাই। তিনি শহীদ হইছেন। শহীদানের কোনো বিচার হয় না। তাই বিচার দাবি করার দরকার নাই। গোলাম আংকল নাগরিকত্ব পাইলো। রাজাকার আবদুর রহমান বিশ্বাস হইলো রাষ্টপতি। ইসলামাবাদ থেকে সাবাশি ফোন আসলো, আফসোস কইরা বলা হইলো একাত্তরে ল্যাকটেটিং না হইলে তোমারে আরও বড় একটা ইনাম দিতাম। আগামীতে পূর্ব পাকিস্তান শাসন করতো সে। বেগম কইলেন ছোড়ো, তারেক কি আপনার সন্তানের মতো না। উত্তর আসলো জরুর জরুর।

বেগম এখন এক আত্মঘাতি বোমা বুকে বাইন্ধা অপেক্ষা করতেছেন। বয়স হইছে, কবরে এক পা চলে গেছে, রাজনীতিতে তার দিন ফুরাইছে। তারেক এখন বালেগ, হিসাব কিতাব দশ পার্সেন্টের থিকা এখন বেশী বুঝে। ওর হাতে দল। দেশটাও তুইলা দিতে হইলে কাটা সরাইতে হবে। সেটা সরানোর উপায় হইলো ওই বিশেষ বোমা। নিজে মইরা শেখ হাসিনারে মারার জন্য বিশেষ ভাবে তৈরি এই বোমার নাম মাইনাস টু। যা ফুটলে মুড়ি মুড়কি এক হইয়া যায়। চিংকুসরা ফিল্ডে আছে। ভাসানীর দলের কিছু, তোয়াহার কিছু, বদুর কিছ, নুরুল কবিরের কিছু। জামাত দিন গুনে। সেনাশাসন মানেই জামাতের নিরাপত্তা, সবচেয়ে নিরাপদ হইলো তারা ওই একটা সময়েই। গোলাম মরার আগে সর্বশেষ সাক্ষাতকারে নিজের মুখেই স্বীকার করছে, জামাতের হেডকোয়ার্টার তখনও ছিলো লাহোর, এ্খনও লাহোর। ইসলামে জমিয়তে তালিবা বা ইসলামী ছাত্র শিবিরেরও তাই। তারা বাংলাদেশে বিশ্বাস করে না। তারা চায় পাকিস্তান।

মরতেছে বাঙালী একাত্তরের মতোই। ধরা পড়তেছে শিবির। মরতেছে শিবির নেতা। কিন্তু পোড়ানি থামে না। এইতো আরেকটু। আর কয়েকশো মারলেই উত্তর থেকে গরম হাওয়া বইবে। ভারত তো আগেই কইছে এইটা বাংলাদেশের আভ্যন্তরীন সমস্যা, তাগো নাক পিনোকিওর মতো না। ওবামা কইছে এই খারাপ কাম বন্ধ করো, গণতন্ত্রের পরিবেশ বানাও। নোবেল লরিয়েটরা হার হাইনেসের নাইট স্যাররাও অপেক্ষা করতেছেন। জাতীয় সরকারের লাইগা। শাহবাগে দীর্ঘশ্বাসের লগে শুনা যাইতেছে ইমরানরে ছাইড়া ভুল করলাম নিকি। তারে সরকারে ঢুকাইলে তো লগে চিংকুগুলাও ঢুকবো। ফেসবুকে মধুরে দেখা যায় না ক্যান জিগাইলে বাংলাশেষের জনপ্রিয়তম ফেসবুকার নিশ্চিত করে, ডোন্ট ওরি সে জেডফোর্স নিয়া ব্যস্ত, ছিপির উপযোগিতা এখন নাই।

লন্ডন থিকা ফোন আসে। আম্মি, তোমার এক্স হাজবেন্ড জানি কোন একটা গান গাইতো? কি জানি লাইনগুলা। বাংলাশেষ না? বেগম কয়, হ, বাংলাশেষ। অতীতের স্মৃতি আপ্লুত করে তারে, কানে ভাসে, শেষ শেষ, বাংলাদেশ, বাংলাশেষ…

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ইং

* অমি রহমান পিয়াল এর অন্য লেখাগুলো পড়তে ক্লিক করুন।

পরিচিতি: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক, ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট


এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। ebizctg.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে ebizctg.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply