কে বাংলাদেশের বেস্ট সেলার লেখক?

0

।। প্রভাষ আমিন ।।

অমর একুশে গ্রন্থমেলা এখন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। আর এ মাসজুড়ে বইমেলাকে কেন্দ্র করে যে উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে, তার কোনো তুলনা নেই। বাংলাদেশের প্রকাশনাশিল্প ফেব্রুয়ারিকেন্দ্রিক। বছরজুড়ে অধিকাংশ প্রকাশক শীতনিদ্রায় থাকেন বা অন্য প্রকাশনায় ব্যস্ত থাকেন। ফেব্রুয়ারি এলেই আড়মোড়া ভেঙে প্রস্তুতি নেন সৃজনশীল প্রকাশনার। বইমেলা শেষ হলেই তাদের ব্যস্ততা ফুরিয়ে যায়। ফেব্রুয়ারির প্রকাশনা বিক্রি-বাট্টা করেই কাটে তাদের বছর। হাতেগোনা দু-একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অনিয়মিত হলেও সারা বছর একটি-দুটি বই প্রকাশ করে। বইমেলা যতই আনন্দের উপলক্ষ হোক, শুধু বইমেলাকেন্দ্রিক আয়োজন প্রকাশনাশিল্পের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়। এটা একটা রুগ্নশিল্পের লক্ষণ। বাংলাবাজারজুড়ে এখন বইমেলার প্রস্তুতি। এ সুযোগে ঘুরে আসা যাক প্রকাশনাশিল্পের ভেতর-বাহির।

প্রকাশকরা বইমেলাকেন্দ্রিক বলে লেখকরাও বইমেলাকে ঘিরেই তাদের লেখালেখি, ভাবনা সীমিত রাখেন। মেলার আগে আগে প্রকাশকের তাগাদায় শুরু হয় লেখালেখি। জনপ্রিয় লেখকদের কেউ ছুটি নিয়ে, এমনকি হোটেলে লুকিয়ে লেখালেখি করেন। কিন্তু একজন লেখকের তো সারা বছরই সক্রিয় থাকার কথা। এমন তো নয়, ফেব্রুয়ারি এলেই তার লেখার ভাব আসে। একজন লেখক কেন বইমেলার অপেক্ষায় থাকবেন। আমি জানি এ চক্রটা ভাঙা কঠিন, তবে ভাঙা উচিত।

প্রকাশনাশিল্পের সঙ্গে মেধা আর সৃজনশীলতার সম্পর্ক। কিন্তু যতই মেধা আর সৃজনশীলতার সম্পর্ক থাকুক; প্রকাশকদের কাছে এটা নিছক ব্যবসা। বই প্রকাশ করে, তা বিক্রি করাই প্রকাশকদের রুটি-রুজি। খুবই একটি বিপ্লবী, চিন্তাশীল বই প্রকাশিত হলো; কিন্তু বিক্রি হলো ৬৫ কপি; তাতে প্রকাশকদের ভাত জুটবে না। প্রকাশনাশিল্পের প্রধান কাঁচামাল লেখকের মেধা। তারপর প্রচ্ছদশিল্পী, প্রুফরিডার, কাগজ, প্রেস, ছাপা, বাঁধাই, বিক্রি- নানা ধাপ পেরিয়েই একটি বই আলোর মুখ দেখে। প্রতিটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সম্পাদনা পরিষদ বা নিদেনপক্ষে একজন সম্পাদক থাকা উচিত। তিনি বা তারা ঠিক করে দেবেন, কোন বই প্রকাশিত হবে, কোন বইয়ে কী থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশে অধিকাংশ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানেরই সম্পাদক নিয়োগ করার মতো সংগতি নেই। অনেক সময় প্রকাশক জানেনই না কী থাকছে তার প্রকাশিত বইয়ে। প্রকাশনাশিল্পের মূল যে কাঁচামাল লেখকের মেধা, সেটাই সবচেয়ে অবহেলিত বাংলাদেশে। বিভিন্ন মাধ্যমে দেখছি, গত বছরের বইমেলায় রেকর্ড ৬৫ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। এটা নিশ্চয়ই আনন্দের সংবাদ। ১৫ শতাংশ হারে রয়্যালিটি দিলে লেখকদের পাওয়ার কথা ৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। আমার ধারণা, ৭৫ লাখ টাকাও পাননি লেখকরা। তাহলে বাকি ৯ কোটি টাকা গেল কোথায়? বাংলাদেশে এখন নিয়মিত রয়্যালিটি পান, এমন লেখক আছেন বড়জোর ৩০ জন। লেখকদের একটা সাধারণ অভিযোগ, প্রকাশকরা সব সময় গলা শুকান, বই বিক্রি হয় না। রয়্যালিটি দেব কোত্থেকে! এটা অনেকাংশে সত্যি বটে। তবে ঢালাও অভিযোগ ঠিক নয়। অধিকাংশ প্রকাশকই লেখকদের রয়্যালিটি দেন না এটা যেমন সত্যি, আবার অনেকে নিয়মিত রয়্যালিটি দেন, এটাও তো সত্যি। কোনো কোনো প্রকাশক বছর পেরিয়ে গেলেও রয়্যালিটি তো দূরের কথা, বই বিক্রির হিসাবই দেন না। হতে পারে, বিক্রি এত কম হয়েছে, প্রকাশক লেখককে বিব্রত করতে চান না।

আবার এমন প্রকাশকও আছেন, মেলা শেষ হওয়ার আগে রয়্যালিটির চেক বুঝিয়ে দেন লেখককে। আসলে প্রকাশকের ব্যবসা তো এক মৌসুমের না। এখন কোনো প্রকাশক যদি মুহম্মদ জাফর ইকবালকে তাঁর প্রাপ্য রয়্যালিটি না দেন, পরের বছর তো তিনি আর সেই প্রকাশককে বই দেবেন না। খবর পেলে জাফর ইকবালের বই ছাপার জন্য অন্য প্রকাশকরা আগাম টাকা নিয়ে তার বাসার সামনে লাইন দেবে। তাই আপনার বই যদি ভালো বিক্রি হয়, প্রকাশক আপনার বাড়ি এসে টাকা দিয়ে যাবে। বই বিক্রি না হলে প্রকাশক তো বাড়ি থেকে এনে টাকা দেবে না। সব লেখক তো আর জাফর ইকবাল, ইমদাদুল হক মিলন বা আনিসুল হক নন। কম বই বিক্রি হয়, এমন লেখকদের খুব একটা পাত্তা দেন না প্রকাশকরা।

এমনিতে প্রতিটি বই বিক্রি হলে লেখককে ১৫ শতাংশ হারে রয়্যালিটি দেওয়ার কথা। কিন্তু অন্তত ২০০ কপি বই বিক্রি না হলে প্রকাশকের পুঁজি উঠে আসে না। তাই দুইশোর বেশি বই বিক্রি হলেই কেবল লেখক রয়্যালিটির দাবিদার হন। কিন্তু বিক্রির সংখ্যা নিয়েই রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি। অধিকাংশ প্রকাশক সত্যিটা বলেন না। এখানে লেখকের কিছুই করার নেই। প্রকাশক যা বলেন, তাই বিশ্বাস করতে হয়। লেখক তো আর গোয়েন্দা নন। কোথায় যেন পড়েছিলাম, একজন মাঝারি জনপ্রিয় লেখক মেলার সময় নিজেই নিজের ৩০০ কপি বই কিনে নেন। কিন্তু মেলার পর যখন বিক্রির হিসাব চাইলেন, বিক্রেতা খুব মুখ কালো করে বলল, ২৫২ কপি!

আবার বইমেলায় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বেস্ট সেলার লেখক হওয়ার, সংস্করণ বা মুদ্রণ ফুরিয়ে যাওয়ার নানান গল্পও অনেকেই জানেন। সবার আগে ছাপা হয় তৃতীয় মুদ্রণ, তারপর প্লেট পাল্টে দ্বিতীয়, তারপর প্রথম মুদ্রণ। সবার শেষে ছাপা হওয়া বই বাজারে আসে সবার আগে। এভাবে ৬০০ কপি বই ছেপেই বেস্ট সেলার, তৃতীয় মুদ্রণ বা দ্বিতীয় সংস্করণের তকমা পেয়ে যান অনেক লেখক। সাধারণত একটি বইয়ের প্রথম সংস্করণে ১২৫০ কপি ছাপার কথা। কিন্তু ১২৫০ কপি বই বিক্রি হয়, এমন লেখক বাংলাদেশে আছে ৩-৪ জন। তাই ২০০ কপিতেই হয়ে যায় মুদ্রণ, ৩০০ কপিতে সংস্করণ!

আগেই বলেছি, বাংলাদেশে রয়্যালিটি পান, মানে যাদের বই বিক্রি করে প্রকাশকের ব্যবসা হয়, এমন লেখকের সংখ্যা বড়জোর ৩০ জন। কিন্তু গত বইমেলায় অন্তত ৪ হাজার বই প্রকাশিত হয়েছে। ৪ হাজার বই লিখতে অন্তত আড়াই হাজার লেখক দরকার। সব লেখক প্রতিদিন বইমেলায় গেলে তো আর কারো যাওয়ারই দরকার হতো না। এবার বলুন, আপনি কজন লেখকের নাম বলতে পারবেন? গত বইমেলায় অন্তত ৪৫০ প্রকাশক স্টল পেয়েছিলেন। ৩০ জন পাঠকপ্রিয় লেখকের ওপর ভিত্তি করে ৪৫০ প্রকাশক কীভাবে ব্যবসা করেন? এই ফাঁকিটা কোথায়? এই ফাঁকিটা পূরণ করেন ‘মুরগি লেখক’রা। কিছু লেখক আছেন, প্রকাশকরা যাদের বলেন ‘মুরগি লেখক’। প্রকাশকদের কেউ কেউ সারা বছর এই ‘মুরগি’ ধরার ফাঁদ পাতেন। চার ফর্মার একটা বইয়ের ২০০ কপি ছাপতে খরচ হয় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। কিন্তু প্রকাশকরা ‘মুরগি লেখকের’ কাছ থেকে নেন লাখ টাকার বেশি। তার ওপর থাকে বই কিনে নেওয়ার শর্ত। বছরে এমন ৫-৭ জন মুরগি লেখক ধরতে পারলেই একজন প্রকাশকের হয়ে যায়। এমন বইয়ের পাশাপাশি প্রেস্টিজ বজায় রাখতে প্রকাশকরা কয়েকজন নামি লেখকের বইও ছাপেন। নামি হলেও তাদের বই বিক্রি হয় হয়তো ৯৫ কপি। মুরগি লেখকের লাভ থেকে, এই ক্ষতিটা প্রকাশকরা পুষিয়ে নেন। ৯৫ কপি বিক্রি হবে জেনেও প্রকাশকরা প্রয়োজনে আগাম রয়্যালিটি দিয়ে নামি লেখকদের বই ছাপেন প্রকাশক সমাজে নিজেদের মর্যাদা বজায় রাখার জন্য। ইদানীং আবার প্রকাশকদের ব্যবসার আরেক উৎস প্রবাসী লেখক। তারাও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে বই ছাপেন। প্রভাবশালী আমলা, কাস্টমস কর্মকর্তা, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বই ছেপেও প্রকাশকরা নানাভাবে লাভবান হন।

ফেব্রুয়ারি মাসের পত্রিকায় আমার সবচেয়ে প্রিয় বইয়ের বিজ্ঞাপন। আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ি আর তালিকা করি। এ বিজ্ঞাপন দেখতে গিয়েই দেখি নানান মজার জিনিস, মনে জাগে নানা প্রশ্ন। অনেক লেখক আছেন, যারা গাঁটের পয়সা খরচ করে বইয়ের বিজ্ঞাপন দেন। আগে এ বাণিজ্যটা ভালো জানতাম না। নিজের বই প্রকাশের সময় বিজ্ঞাপন দিতে গিয়ে দেখলাম, বইয়ের বিজ্ঞাপন দেওয়া অনেক খরচান্ত ব্যাপার। প্রথম আলোতে একটা ছোটখাটো বিজ্ঞাপন দিতেও হাজার দশেক টাকা বেরিয়ে যায়। কিন্তু অনেক লেখক বা প্রকাশককে দেখি দিনের পর দিন বড় বড় সাইজের বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি প্রথম আলোতে আগাম টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন দিতে হয়। আমি হিসাব করে দেখেছি কোনো কোনো লেখকের বিজ্ঞাপনই ছাপা হয় কয়েক লাখ টাকার।

আগেই বলেছি, বাংলাদেশের স্ট্যান্ডার্ড লেখক সম্মানী হলো ১৫ শতাংশ। মানে একশ টাকা দামের একটি বই বিক্রি হলে লেখক পাবেন ১৫ টাকা। ২০০ টাকা দামের একটি বই বিক্রি হলে লেখক পাবেন ৩০ টাকা। এখন তাকে ১ লাখ টাকা সম্মানী পেতে হলে অন্তত সাড়ে ৩ হাজার কপি বই বিক্রি হতে হবে, ২ লাখ টাকা পেতে হলে ৭ হাজার কপি বই বিক্রি হতে হবে। এটা ঠিক বইয়ের বিজ্ঞাপন আসলে লেখকের নয়, প্রকাশকের দেওয়ার কথা। কারণ পণ্যটা প্রকাশকের। কিন্তু বাংলাদেশে হাজারের ওপর বই ছাপা হয়, এমন লেখকই আছেন কয়েকজন। প্রকাশকরাও বইয়ের বিজ্ঞাপন দেন। তবে সবার বই নয়, যার বই বিক্রি বেশি হয় তার। কারণ প্রকাশকের কাছে এটা নিছকই ব্যবসা। নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে লেখকের বই ছাপছেন, আবার পয়সা দিয়ে তার বইয়ের বিজ্ঞাপনও ছাপবেন, এতটা উদার তারা নন। এখানে একটা মজার চক্র আছে।

প্রকাশকরা এমন লেখকের বইয়ের বিজ্ঞাপন দেন, যার বই অনেক বিক্রি হয়, যাতে তার বিজ্ঞাপনের টাকা উঠে আসে। কিন্তু নতুন বা তরুণ লেখকদের বইয়ের বিজ্ঞাপন দেন না। কারণ দিলে বিজ্ঞাপনের টাকাটাই বাড়তি লস। কিন্তু যাদের বই চলে, পাঠকরা এসে খুঁজে খুঁজে তাদের বই কেনেন, জাফর ইকবালের বইয়ের বিজ্ঞাপন লাগে না। নতুন লেখকদের বই বরং বিজ্ঞাপন দিয়ে পাঠকদের জানাতে হয়। সমস্যাটা হলো যাদের বই চলে না, তাদের বই বিজ্ঞাপন দিলেও চলে না, অন্তত বিজ্ঞাপনের টাকা উঠে আসার মতো চলে না। এ এক অভেদ্য চক্র। আমার হিসাবে প্রকাশক বিজ্ঞাপন দিতে পারেন বা বই বিক্রি থেকে বিজ্ঞাপন দেওয়ার টাকা উঠে আাসবে, এমন লেখক আছেন বাংলাদেশে বড়জোর ২০ জন। কিন্তু বইমেলার সময় পত্রিকার পৃষ্ঠাজুড়ে থাকে বইয়ের বিজ্ঞাপন। শুক্রবারে তো পত্রিকা ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে। তাহলে এই লাখ লাখ টাকার বিজ্ঞাপন কে দেয়, কেন দেয়? কিছু লেখককে দেখি প্রতিবছরই কয়েক লাখ টাকা বিজ্ঞাপনের পেছনে খরচ করেন, কিন্তু রয়্যালিটি পান বড়জোর কয়েক হাজার টাকা। লেখক হিসেবে নাম ফাটানোর জন্য প্রতিবছর কয়েক লাখ টাকা ভর্তুকি দিতে অনেক টাকা থাকতে হয়।

লেখার মান যেমনই হোক, বাংলাদেশে পয়সাওয়ালা লেখক অনেক আছেন। আপনারা বইমেলার সময় পত্রিকার বিজ্ঞাপনের পাতা দেখলেই তাদের নামের তালিকা পেয়ে যাবেন। বই বিক্রি হোক আর না হোক, প্রতিদিন পত্রিকায় বড় বড় হরফে ছাপা হওয়ার সুবাদে মেলায় তারা সেলিব্রিটি লেখক বনে যান। আর যদি কোনোরকমে একটা পুরস্কার ম্যানেজ করতে পারেন, তাহলে তো কথাই নেই। বি-শা-ল লেখক। বিজ্ঞাপনেই স্বঘোষিত বেস্ট সেলার, সপ্তাহেই মুদ্রণ ও সংস্করণ ফুরিয়ে যাওয়া লেখকদের দেখা মেলে।

প্রকাশনাশিল্পের খেলার মাঠটি ইদানিং অসমতল হয়ে উঠেছে। সংবাদপত্রে যেমন প্রথম আলো, প্রকাশনাশিল্পে তেমনি প্রথমা উৎকর্ষের একটি অনতিক্রম্য মান নির্ধারণ করে দিয়েছে। প্রথমার বই মানেই চোখ বন্ধ করে কেনা যায়। বিষয়, ছাপা, বাঁধাই, প্রুফ, প্রচ্ছদ- সব মিলিয়ে প্রথমার বই হাতে নিলেই মন ভালো হয়ে যায়। কিন্তু প্রথমা অন্য প্রকাশকদের ব্যবসা সত্যি কঠিন করে দিয়েছে। কারণ প্রথমার পাশে আছে প্রথম আলো, অন্যদের তো তা নেই। প্রথমার বইয়ের নির্বাচিত অংশ প্রথমে প্রথম আলোতে ছাপা হয়। সাহিত্য পাতায় রিভিউ ছাপা হয়। প্রকাশনা উৎসবের বিশাল রিপোর্ট ছাপা হয়। এভাবে পাঠকদের মধ্যে তুমুল কৌতুহল তৈরি করা হয়। তারপর বই প্রকাশ হলেই হট কেক। সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্রথমার বইয়ের যে বিজ্ঞাপন প্রথম আলোতে ছাপা হয়, অন্য কোনো লেখক বা প্রকাশকের পক্ষে তার দশ ভাগের এক ভাগও দেওয়া সম্ভব নয়। প্রথমার বইয়ের বিজ্ঞাপনকে টাকার অঙ্কে কনভার্ট করলে তা কারো পক্ষেই বহন করা সম্ভব নয়।

হুমায়ূন আহমেদ বা জাফর ইকবালের বইয়েরও অত টাকার বিজ্ঞাপন করা সম্ভব নয়। প্রথম আলোর সহায়তায় প্রথমা যেভাবে তাদের কোনো কোনো বইয়ের পরিকল্পিত ও কৌশলী প্রচারণা চালায়; তা অন্য কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তাই প্রথমা প্রকাশিত কোনো বই যদি ৫ হাজার বিক্রি হয়, সেই একই বই অন্য কোনো প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হলে পাঁচশও বিকোবে না। বই তো আসলে মান দেখে বিক্রি হয় না, বিক্রি হয় হাঙ্গামা দেখে। এ কে খন্দকারের বিতর্কিত বই যত লোক কিনেছেন, তত লোক কি পড়েছেন?

বইমেলায় এত বই কেন, এত কবি কেন, এত লেখক কেন; এ নিয়ে দেখি অনেকের হা-হুতাশ। আরে ভাই আপনার সমস্যা কী? আপনার ভালো না লাগলে কিনবেন না, ব্যস। তারা তো বইই লিখছেন। এই লেখকেরা যদি বই না লিখে চাঁদাবাজি করত, আপনি খুশি হতেন? লিখুক না, লিখতে লিখতে হয়তো একদিন তার কাছ থেকেই একটা ভালো বই পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশে বেস্ট সেলার লেখক কে? আমি জানি, আপনারা সবাই এই প্রশ্নের উত্তর জানেন। আমিও জানি, হুমায়ুন আহমেদ। দ্বিতীয় অবস্থানটি তাঁর ছোট ভাই মুহাম্মদ জাফর ইকবালের। কিন্তু গত বছরের বইমেলায় এই মিথ ভেঙ্গে গেছে। অন্তত গত বইমেলায় বাংলাদেশের বেস্ট সেলার লেখক ছিলেন ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক ও সভাপতি। এ দুজনের নাম ও বইয়ের নাম আমি জানি, কিন্তু লিখছি না। কারণ আমি এটাও জানি এখানে ব্যক্তি বা বই গুরুত্বপূর্ণ নয়। এমনও নয় যে ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগাররা হঠাৎ পড়ুয়া হয়ে গেছেন। যদি সেটাই হতো, তাহলে শেখ হাসিনার বই উঠে আসতো বেস্ট সেলারের তালিকায়। তাহলে হঠাৎ ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতার বই কেন উঠে গেল বিক্রির শীর্ষে? তাদের বইয়ে এমন কী গোপন রহস্য আছে? আসল রহস্য হলো, ছাত্রলীগের দুই নেতা মেলার স্টলে বসে অটোগ্রাফ দিয়েছেন। সেটাও সমস্যা নয়। অনেক লেখকই মেলায় নির্ধারিত স্টলে বসে অটোগ্রাফ দিয়েছেন।

আসল কথা হলো, নেতার কাছে নিজের চেহারা দেখানো, নেতার প্রতি আনুগত্য দেখানো, খাস বাংলায় তেল মারা। শেখ হাসিনার বই কিনলে তো সেটা তিনি দেখতে পাচ্ছেন না, তাই সেই বই কিনে লাভ কী। তাই শেখ হাসিনার বই বিক্রি হয় শয়ের ঘরে। আর ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতার বই বিক্রি হয় হাজার হাজার। আমার ঘোরতর সন্দেহ যারা ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারন সম্পাদকের বই কিনেছেন, তাদের ক’জন সেটি উল্টে দেখবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেশ কয়েকটি বই আছে। গত মেলায় প্রকাশিত হয়েছে তার প্রবন্ধ সংগ্রহ। তাছাড়া মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে আবুল মাল আব্দুল মুহিত, নুরুল ইসলাম নাহিদ, ওবায়দুল কাদেরও লেখালেখি করেন। তাদের কারো বইয়ের বিক্রিই ছাত্রলীগের দুই নেতার বইয়ের ধারেকাছে নেই। আবার এই নেতাদের কেউ, বিশেষ করে ওবায়দুল কাদের যদি নিয়মিত স্টলে বসে অটোগ্রাফ দিতেন তাহলে তার বইও লাখ কপি বিক্রি হতে পারতো।

রাজনৈতিক নেতাদের লেখা বই নয়, আসলে বিক্রি হয় অটোগ্রাফ। নিজেরা স্টলে বসে অটোগ্রাফ দিলেই বই বিক্রি হবে, এই মজাটা জেনে গিয়েছিলেন ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক। তাই দুজন প্রায় অভিন্ন বিষয়, মানে ছাত্রলীগের ইতিহাস নিয়ে বই লিখেছেন। তাতে দুইটা লাভ। এক হলো, মোটা অঙ্কের রয়েলিটি পাবেন, দুই, লেখক পরিচিতি দলে এবং সমাজে তাদের এবং সংগঠনের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে।

ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক বই লিখেছেন, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। বরং তাদের এই ইতিহাস চর্চা দেখে আমি খুবই আনন্দিত। আমার খালি আকাঙ্খা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী যারা তাদেও নেতাদের বই কিনেছেন, তারা যেন বইগুলি পড়ে দেখেন, আত্মস্থ করেন। ছাত্রলীগের গৌরবময় ইতিহাস যেন তাদের অনুপ্রাণিত করে। তারা যেন সেই গৌরবের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। তাদের কোনো কর্মকান্ডের কারণে যেন ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি নষ্ট না হয়।

তবে আমি খুব আশাবাদী হতে পারি না, কারণ বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রকাশিত হয়েছে ২০১২ সালে, অনেক বিক্রিও হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কর্মকান্ডে মনে হয় না, তারা বঙ্গবন্ধুর জীবন থেকে কিছু শিখেছেন। তারা বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ আত্মস্থ করলে বাংলাদেশের রাজনীতির চেহারা বদলে যেতে পারতো। বঙ্গবন্ধুকে পড়লে তারা জানতেন, রাজনীতি মানে ভোগ নয়, ত্যাগ।

* প্রভাষ আমিন এর অন্য লেখাগুলো পড়তে ক্লিক করুন

পরিচিতি: বার্তাপ্রধান, এটিএন নিউজ


এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। ebizctg.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে ebizctg.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply