উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক বিপ্লবের সূচনা হতে পারে লালমনিরহাট বিমানবন্দর

0

‘এশিয়ার ২য় বৃহত্তম’ হিসেবে এক সময় খ্যাতি পাওয়া লালমনিরহাট বিমানবন্দরটি এখন পশু চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। প্রায় ৪ যুগ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে জেলা সদর ও মহেন্দ্রনগরের মাঝামাঝি স্থানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত এ বিমানবন্দর। অথচ সরকারিভাবে বিমানবন্দরটি মেরামত এবং সংস্কার করে চালু করলেই পাল্টে যাবে উত্তরাঞ্চলের দৃশ্যপট। এতে করে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার যেমন ঘটবে তেমনি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবে এ অঞ্চলের মানুষ। একই সঙ্গে বাড়বে সরকারের রাজস্ব আয়।

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অতি পুরনো লালমনিরহাট বিমানবন্দর হতে পারে উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগের একটি অন্যতম দ্বার। স্থানীয় রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও এমনটাই মনে করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তৈরি এই বিমানবন্দরটি প্রায় ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনোরকম সংস্কার ছাড়াই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

স্থানীয়রা মনে করেন, লালমনিরহাট বিমানবন্দরটি চালু হলে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটবে। সুযোগ তৈরি হবে নতুন নতুন ব্যবসা-বাণিজ্যের। যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। ভারতের সেভেন সিস্টার হিসেবে পরিচিত সাত রাজ্যসহ আশপাশের আরও কয়েকটি রাজ্য, নেপাল এবং ভূটানের সঙ্গে বাংলাদেশের উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগ তৈরির একটা অন্যতম মাধ্যম হতে পারে লালমনিরহাট বিমানবন্দর। এটিকে সংস্কারের মাধ্যমে নতুন করে চালু করা হলে এই অঞ্চলের চেহারাই পাল্টে যেতে পারে। বিমানবন্দরটি চালু হলে ভারত, নেপাল এবং ভূটানের সব শ্রেণির মানুষ অনায়াসে কম খরচে বাংলাদেশে আসতে পারবে। একইভাবে বাংলাদেশিরাও ভারত, নেপাল ও ভূটানে অল্প খরচে গিয়ে সব কাজ করতে পারবে। পর্যটকদের জন্যও বিমানের এই রুটটি হতে পারে খুবই সম্ভাবনাময়। কারণ এই রুট ব্যবহার করলে কম খরচেই পর্যটকরা বাংলাদেশে আসতে পারবেন। চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকরাও সুবিধা পাবে। একই সঙ্গে নেপাল, ভূটান ও ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা শিক্ষার্থীরাও উপকৃত হবে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

এর বাইরে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বিমানবন্দরটি চালু হলে লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দর, কুড়িগ্রামের সোনাহাট স্থলবন্দরও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ভারত, ভূটান ও নেপালের ব্যবসায়ীদেরও বাংলাদেশে যাতায়াত সহজ হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বাংলাদেশের উত্তরের জনপদ। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ‘লালমনিরহাট বিমানবন্দর’টি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংরেজ সরকারকে তথা তৎকালীন ভারতবর্ষকে রক্ষার একটি প্রধান বিমান ঘাঁটি। এই বিমানবন্দরের কারণেই ব্রিটিশরা ওই সময় ঠেকিয়ে দিয়েছিল নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের অগ্রযাত্রাকে। লালমনিরহাটকে তখন বলা হতো ‘গেটওয়ে টু নর্থ-ইস্ট’ এবং ‘মাউথ অব আসাম’; ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং তখনকার বিশাল প্রদেশ বৃহত্তম আসামে প্রবেশের একমাত্র পথ ছিল লালমনিরহাট। রেলপথের ‘লালমনিরহাট জংশন’ এবং বিমান পথে ‘লালমনিরহাট জাহাজ ঘাঁটি’।

ভারত ভাগ না হলে লালমনিরহাট তার এই যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বের জন্য আপন মহিমায় হয়ে উঠত আরেক ‘দ্বিতীয় কলকাতা’। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে এক হাজার ১৬৬ একরের বিশাল আয়তনের লালমনিরহাট বিমানবন্দর। প্রায় ৪ মাইল লম্বা রানওয়ে, বিশাল টারমার্ক, হ্যাঙ্গার এবং ট্যাক্সিওয়ে থাকলেও ঐতিহাসিক এই বিমানবন্দরটি আজ একেবারেই অবহেলিত, জৌলুশহীন ও বিবর্ণ। লালমনিরহাট বিমানবন্দরের গৌরবময় অতীত এখন শুধুই ইতিহাস।

‘মঙ্গা’র দুর্নাম ঘুচিয়ে অবহেলিত উত্তরাঞ্চলে এখন লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া। উন্নয়নের ফলে দেশের জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় লালমনিরহাটের জনগণেরও ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। এ অবস্থায় লালমনিরহাট বিমানবন্দরটি যাত্রী পরিবহনের জন্য উন্মুক্ত করে দিলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পেত, তেমনি এলাকারও উন্নয়ন হতো, জনগণও লাভবান হতো। দ্রুত সময়ে রাজধানী ঢাকায় যাতায়াতের সুবিধা পেতেন উত্তর জনপদের মানুষ। মানুষের কর্মঘণ্টাও বেঁচে যেত। বিমানবন্দরটিও ফিরে পেত তার অতীত গৌরব।

বিমানবন্দরটি চালু হলে ভবিষ্যতে উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগ গড়ে উঠবে। নেপাল, ভূটান, শিলিগুড়ি রুটে যাত্রী পরিবহন করার সুযোগ ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মর্যাদাও পেত এটি। জানা গেছে, ১৯৫৮ সালে স্বল্প পরিসরে পুনরায় বিমান সার্ভিস চালু হয় লালমনিরহাট বিমানবন্দরে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চালু থাকেনি।

লালমনিরহাট পৌরসভার মেয়র রিয়াজুল ইসলাম রিন্টু বলেন, বিমানবন্দরটি চালু হলে এলাকার উন্নয়ন অনেকাংশে ত্বরান্বিত হবে। এফবিসিসিআইর পরিচালক সিরাজুল হক মনে করেন, বিমানবন্দরটি চালু হলে এলাকার ব্যবসা বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। লালমনিরহাট সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এম মমিনুল হক বলেন, ‘এলাবাসীর দাবি লালমনিরহাট বিমানবন্দরের ঐতিহ্য ফিরে আসুক এবং বিমানবন্দরটি পুনরায় চালু করা হোক। বিমানবন্দরটি চালু হবে এটি জেলাবাসীর প্রাণের দাবি।’

জেলার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট পাল্টে দিতে বিমানবন্দরটি চালু জরুরি এবং সময়ের দাবি। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের লালমনিরহাট জেলা সমন্বয়কারী ও আরটিভির স্টাফ রিপোর্টার হাসান উল আজিজ এবং সিনিয়র সাংবাদিক আলতাফুর রহমান আলতাফ জানান, এই বিমানবন্দর চালু হলে রংপুর অঞ্চলের অর্থনৈতিক দ্বার থেকে শুরু করে কয়েকটি দেশের সঙ্গে শিক্ষা-চিকিৎসার ব্যাপক প্রসার ঘটবে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, ভূটান সরকার লালমনিরহাট বিমানবন্দরটি ব্যবহারের জন্য পছন্দের তালিকায় রাখলেও আকাশসীমা নিয়ে জটিলতা থাকায় তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। ভারত, বাংলাদেশ ও ভূটানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় একটি চুক্তি হলেই বন্দরটি ব্যবহার করা যাবে।


এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। ebizctg.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে ebizctg.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।