চায়না হারবারের ঘুষ কেলেঙ্কারি ও চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে

0

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১০ টন ক্ষমতাসম্পন্ন ১২টি মোবাইল ক্রেন কেনার টেন্ডার আহ্বান করে। এতে ৫টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়ে ইকম ট্রেড হোল্ডিং প্রাইভেট লিমিটেড ওফেরিটেক প্রাইভেট লিমিটেড যোগ্য বিবেচিত হয়।

১৩ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠান দু’টিকে প্রাইস ওপেনিং চিঠি দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু টেন্ডার মূল্যায়ণ চলাকালে একটি ভুয়া চিঠি দেয় ইকমট্রেড। যা টেন্ডার ক্লজ বিরোধী। এরপরও বন্দরের সদস্য (প্রকৌশল) বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কমোডোর জুলফিকার আজিজ প্রাইজ ওপেনিং চিঠির কার্যকারিতা স্থগিত করেন। পরে টেন্ডার কমিটির সভায় ওই চিঠি ভুয়া প্রমাণিত হলে ২৬ নভেম্বর পুনরায় প্রাইস ওপেনিং এর চিঠি দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। তখন আবারও নৌ-পরিবহন মন্ত্রী বরাবর একটি ভুয়া অভিযোগ দেয় ইকম। সেটি বন্দর চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হলে ২য় বারের মতো প্রাইস ওপেনিং চিঠির কার্যকারিতা স্থগিত করে পুনরায় টেন্ডার আহ্বানের সিদ্ধান্ত দেন বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম খালেদ ইকবাল। এতে বন্দরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র কেনার ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২ বার প্রাইস ওপেনিংয়ের চিঠি দিয়ে টেন্ডার বাতিলের ঘটনা চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে এটিই প্রথম।

এদিকে, মন্ত্রীর কাছে দেওয়া অভিযোগও ভুল প্রমাণ হয়েছে। এছাড়া মিয়ানমারের একটি কোম্পানির নাম ব্যবহার করে অভিযোগ তোলা হলে বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তখন কোম্পানিটি জানায় তারা এ ধরনের কোনো চিঠি দেয়নি। পরে বাংলাদেশে বসে ভুয়া একটি মেইল আইডি থেকে মেইল পাঠানোর প্রমাণ পায় টেন্ডার কমিটি। সেখানে দেখা গেছে, ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট করা মেইলের জবাব এসেছে ৮ আগস্ট!

২০১৩ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে ১০ টন ক্ষমতাসম্পন্ন ১০টি মোবাইল ক্রেন সরবরাহে ২ কোটি ৭৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকার ভুয়া ও জাল পারফরম্যান্স গ্যারান্টি জমা দিয়েছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইকম ট্রেড। প্রাথমিক অনুসন্ধানে সত্যতা পাওয়ার পর ২০১৫ সালের ৫ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম বাদি হয়ে বন্দর থানায় প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে জাল পারফরম্যান্স গ্যারান্টি জমা দেওয়ার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন।

এ ঘটনায় ২০১৭ সালের ১২ জানুয়ারি ইকম ট্রেডের প্রোপ্রাইটর মো. রফিকুল ইসলাম ও প্রিমিয়ার ব্যাংক গুলশান শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক এবং তৎকালীন ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও কান্ট্রি ম্যানেজার মো. কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার বাদি।

দুদক চট্টগ্রামের আদালত পরিদর্শক এমরান হোসেন জানান, মামলাটি বর্তমানে সিএমএম আদালতে চলমান।

সম্প্রতি সড়ক যোগাযোগ ও সেতু সচিবকে ৫০ লাখ টাকা ঘুষের প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চায়না হারবারের স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে ইকম ট্রেড। সেটি পরিচালনা করেন সিঙ্গাপুরে বসবাসরত নুরুল আমিন ওরফে ‘সিঙ্গাপুর আমিন’। ঘুষ কেলেঙ্কারির পেছনেও রয়েছেন তিনি। বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটিয়ে, ঘুষ দিয়ে প্রকল্প হাতিয়ে নেন।

জালিয়াতির মাধ্যমে কাজ হাতিয়ে অবৈধ পথে বিদেশে টাকা পাচার করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে আমিনের বিরুদ্ধে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে দু’টি প্রকল্প হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হলেও বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করে নতুন প্রকল্প নিতে তৎপর রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

১২টি মোবাইল ক্রেন কেনার পুনঃ দরপত্র আহ্বান এবং ইকম ট্রেডের জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে বন্দরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কমোডোর জুলফিকার আজিজ বলেন, বিষয়টি আমার ঠিক মনে নেই। ফাইল দেখে বলতে হবে। কর্ণফুলী ড্রেজিং এর বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা (বন্দর কর্তৃপক্ষ) বাংলাদেশ নেভিকে ড্রেজিং প্রকল্পের কাজ দেব। তারা যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কাজ করাবেন।

জানতে চাইলে ইকম ট্রেডের প্রোপ্রাইটর মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, দুদক একতরফাভাবে অভিযোগপত্র দিয়েছিল। আমরা আমাদের রিপোর্ট দিয়েছি। মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। ১২টি মোবাইল ক্রেনের বিষয়ে তিনি বলেন, খোঁজ নিয়ে আমরা জেনেছি, চীনের প্রতিষ্ঠানটির ক্রেন তৈরির অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা নেই। তাই বিষয়টি বন্দর কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। তবে টেন্ডার ক্লজের ৪৮ ধারা অনুযায়ী টেন্ডারের মূল্যায়ণ চলাকালীন যোগ্য বিবেচিতকোনো প্রতিষ্ঠান আরেকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলে কর্তৃপক্ষ অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানের দরপত্র বাতিল করতে পারে।


এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। ebizctg.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে ebizctg.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply