আলুর ‘দোষ’ কেটেছে: আবার রপ্তানি হবে, কৃষকের মুখে ফুটবে হাসি

0

এক সময় বিদেশে রপ্তানি হতো বাংলাদেশে উৎপাদিত আলু। তবে ব্যাক্টেরিয়ার কারনে মাঝে বন্ধ ছিলো রপ্তানি। সবকিছু সমাধান হয়ে গেছে। সরকার আবার বিদেশে আলু রপ্তানির চিন্তা করছে। কোন কোন দেশে বাংলাদেশের আলুর চাহিদা রয়েছে, চেষ্টা চলছে তাও জানার। প্রতিবছর প্রচুর আলু নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে আলুচাষী ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এমন অবস্থায় দেশের চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত আলু যেন রপ্তানি করা যায়, সে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অতীতে এ ধরনের উদ্যোগ বার বার নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে, এবার সরকার চায়, আলু চাষে কৃষকরা নিরুৎসাহিত না হয় ও ব্যবসায়ীরা যেন ব্যাপক লোকসানের মুখে না পড়েন।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘অতীতে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় আলু রপ্তানি হতো। একইসঙ্গে শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরেও বাংলাদেশি আলুর চাহিদা রয়েছে। কিন্তু আলুতে ব্রাউন রোড ডিজিস নামের এক ধরনের ব্যাক্টেরিয়া ধরা পড়ায় রাশিয়া আলু নেওয়া বন্ধ করে দেয়। রাশিয়ার সেই আপত্তি নিরসন করা হয়েছে। এখন বাংলাদেশে উৎপাদিত আলু সব ধরনের ব্যাক্টেরিয়ামুক্ত। বাংলাদেশ কৃষি বিভাগ এখন ব্যাক্টেরিয়ামুক্ত আলু উৎপাদন করছে। বিষয়টি রাশিয়াকে ইতোমধ্যে জানানো হয়েছে।’ এখন রাশিয়া বাংলাদেশের আলু নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, ‘এই মুহূর্তে বাংলাদেশ থেকে একলাখ মেট্রিক টন আলু রাশিয়ায় রপ্তানির কথা ভাবছে সরকার।’ শুধু রাশিয়া নয়, কোন কোন দেশে বাংলাদেশের আলুর চাহিদা রয়েছে, তা জানাতে সব দেশে বাংলাদেশি মিশনগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর আলুর চাহিদা ৮০ লাখ মেট্রিক টন। গতবছর দেশে ১ কোটি ১৩ লাখ টান আলু উৎপাদিত হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। এই মুহূর্তে দেশের ৩৮০টি হিমাগারে মজুদকৃত আলুর পরিমাণ হচ্ছে ১৫ থেকে ১৬ লাখ মেট্রিক টন। এরই মধ্যে বাজারে আসতে শুরু করেছে নতুন আলু। এখনও অনেক কৃষকের জমিতে আলু রয়েছে। সেগুলোও উঠবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর আশা করছে এ বছরও দেশে ১ কোটি মেট্রিক টনের বেশি পরিমাণ আলু উৎপাদন হবে। এমন অবস্থায় হিমাগারের মজুদকৃত আলু বাইরে আনতে পারছে না লোকসানের ভয়ে। কৃষকরা আর হিমাগারের কাছেই যায় না। কারণ দাম নেই। প্রতি কেজি আলুর উৎপাদনসহ হিমাগারে রাখার খরচ ১৪ টাকা হলেও দেশের উত্তরবঙ্গে এখন ৬০ কেজি আলুর বস্তা ৩০ টাকা দরে বিক্রির জন্য ব্যবসায়ীরা দাম বলছে। এমন অবস্থায় হিমাগারের মালিকরা তাদের হিমাগার খালি করতে ১ কেজি দুধের বিনিময়ে ৬০ কেজি আলু বিক্রির ঘটনাও ঘটিয়েছে। কারণ উত্তরবঙ্গে ১ কেজি দুধের দাম ৪০ টাকা। আলু ব্যবসায়ীরা যে দাম (৬০ কেজি ৩০ টাকা) বলছে, তার তুলনায় ১০ টাকা বেশি পাওয়ায় মালিকরা এভাবে তার গুদাম খালি করার চেষ্টা করছে।

এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সরাসরি আলুর ব্যবহার ও প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, এটি করতে পারলে কৃষকের এই লোকসান কমানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে রপ্তানিযোগ্য জাত উদ্ভাবন করে কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে বলেও মনে করেন তারা।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আলু রপ্তানিতে আয় হয়েছিল ৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। আর চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছর বাংলাদেশ থেকে আলু রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আলু সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় মালয়েশিয়ায়। এ ছাড়া সিঙ্গাপুর, শ্রীলংকা, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ব্রুনাই, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়।

এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আলু রপ্তানিতে সরকার কয়েক বছর ধরে ২০ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দিয়েছিল। ২০১৬ সালে তা কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। এখন আবার নগদ সহায়তা ২০ শতাংশ করা হয়েছে।

কাওরানবাজারের আলু ব্যবসায়ী এম এ সাত্তার বলেন, ‘সরকারের অপরিকল্পনা ও দক্ষতার অভাবে প্রতিবছর ব্যাপক পরিমাণে আলু নষ্ট হচ্ছে। যদিও দেশে আলুর উৎপাদন ব্যাপক বেড়েছে। গত কয়েক বছরে লাখ লাখ টন আলু উদ্বৃত্ত থাকছে। এই অতিরিক্ত আলু রপ্তানির উদ্যোগ নিলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন।’

জানা গেছে, বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন লিখিতভাবে কৃষি মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, এ পর্যন্ত হিমাগারে ৫৩ লাখ টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। যার ৪৫ শতাংশই কম দামে বিক্রি করা হয়েছে। এখনপর্যন্ত ২৯ লাখ টন অবিক্রীত আলু থেকে ১০ লাখ টন বীজ বের হবে। বাকি ১৯ লাখ টন আলু থেকে মৌসুমের আগে ৪ লাখ টন বিক্রি হতে পারে। এরপরও ১৫ লাখ টন রয়ে যাবে। যা বিক্রি হবে না। এ অবস্থায় ওই অবিক্রিত আলু হিমাগারের বাইরে এনে ফেলে দেওয়া ছাড়া আর কোনও কাজ হবে না। এতে প্রতি বস্তা আলু ১ হাজার ৪০০ টাকা দরে প্রায় ২ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই দরে সংরক্ষণ করা ৩৮ লাখ টন আলু ৭০০ টাকা বস্তা হিসেবে বিক্রিতে প্রায় ৩ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। এতে কৃষকদের মোট লোকসান হচ্ছে ৫ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। এই লোকসান ঠেকাতে অ্যাসোসিয়েশন নেতারা আলু রপ্তানির উদ্যোগ বাড়ানোর কথা বলেছেন।


এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। ebizctg.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে ebizctg.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply